সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

তাহিরপুরে যাদুকাটা নদীর তীরে দু’আধ্যাত্বিক মহাসাধকের ভক্তগনের মিলনমেলা



জাহাঙ্গীর আলম ভুঁইয়া,সুনামগঞ্জ:: সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্ত নদী যাদুকাটার দুই তীরে দুইধর্মের-দুইধর্মীয় উৎসব শুরু হবে ২এপ্রিল মঙ্গলবার থেকে। ৩দিন ব্যাপী দুইধর্মের-এই দুইধর্মীয় উৎসব চলবে শুক্রবার পর্যন্ত। একটি হল-হিন্দু ধর্মালম্বীদের পনাতীর্থ বা গঙ্গাস্নান আর অন্যটি হল মুসলমানদের হযরত শাহ আরোফিন (রঃ) এর ওরস মোবারক। এই দুই উৎসবের মধ্য দিয়ে দু’ধর্মের দু’আধ্যাত্বিক মহাসাধকের দেশ,বিদেশেসহ সিলেট বিভাগের সিলেট,হবিগঞ্জ,মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জসহ ৪জেলার লাখ লাখ ভক্তবৃন্ধের আগমনে মিলন মেলায় যাদুকাটা নদী কানায় কানায় পরিপূর্ন হয়ে উঠে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে যাদুকাটা নদীর দুই তীর রাজারগাঁও ও লাউড়েরগড়ে বসে বিরাট বারুনী মেলা বসে। মেলায় ঢল নামে শিশু,নারী,পুরুষসহ সর্বস্থরের জনসাধরনের। এই উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ।

তথ্য নিয়ে জানাযায়,প্রতি বছরের ন্যায় গত এক সপ্তাহ ধরেই দেশের সমগ্র অঞ্চল থেকে হাজার হাজার কাফেলাধারী পাগল ফকির,ভক্ত,সাধক ও দর্শনার্থীরা ওরস এবং ¯œানযাত্রা মহোৎসবে যোগ দিতে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো ও আখড়াবাড়ীর আশে পাশের গ্রামে জড়ো হতে শুরু করেছে এতে করে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। ভক্তদের নিরাপত্তার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে আইন-শৃংখলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা। দুইধর্মের দুই উৎসবের একটি-হিন্দু ধর্মালম্বীদের পনাতীর্থ বা গঙ্গাস্নান ২এপ্রিল মধ্য রাত থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৫টা পর্যন্ত গঙ্গা¯œান শেষ হবে। হিন্দুধর্মালম্বীরা যাদুকাটা নদীতে গাঙ্গা স্নানের মাধ্যমে তাদের সারা বছরের পাপ মোচনসহ পুণ্য লাভের জন্য এখানে আসেন মা,বাবা,স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। ১৫১৬খিষ্টাব্দে পনাতীর্থের সূচনা করেন মহাপুরুষ শ্রীমান অদ্বৈত আর্চায প্রভু। তার জন্ম সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের নবগ্রামে। কিন্তু সেই গ্রাম যাদুকাটা নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে বহু বছর আগেই। এজন্য নদীর তীর সংলগ্ন রাজারগাঁও গ্রামে অদ্বৈত আর্চায মন্দির ও আখড়া তৈরি করা হয়েছে। প্রতি বছরের চৈত্র মাসে এই তৃথীতে গঙ্গাস্নানের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে হিন্দু ধর্মাবলাম্বীরা যাদুকাটা নদীতে ছুটে আসেন।

আর অন্যটি হল-একেই দিনে বাদ আছর ওলি আউলিয়া ও হযরত শাহ আরোফিন (রঃ)এর জীবন দর্শনের উপর আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে ৩দিন ব্যাপী বার্ষিক ওরস মোবারক আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হবে আর শেষ হবে আখেরী মোনাজাতের মধ্য দিয়ে। মুসলমান ধর্মালম্বীরা তাদের মনোবাসনা পূরণ ও সিদ্ধি লাভের আশায় শাহ আরোফিন (রঃ) এর ওরসে যান। মুসলমানদের ৩৬০আওলিয়ার মধ্যে শাহ আরোফিন (রঃ) ছিলেন অন্যতম। সবাই জানেন তিনি একজন জিন্দা পীর। তিনি ভারতের মেঘালায় পাহাড়ের বড়বড় পাথরের গুহায় বসে আল্লাহ ইবাদত করতেন। ওইটাই ছিল তার একমাত্র আস্তানা,বাংলাদেশে কোন আস্তানা নেই। কিন্তু ভারতের সেই আস্তানায় ভক্তদের যেতে দেয় না ভারতীয় বিএসএফ। তাই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের লাউড়েরগড় এলাকায় জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন স্থানে শাহ আরোফিন (রঃ)এর আস্তানা তৈরি করে সেখানেই ওরস পালন করা হয়।

স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ রয়েছে,এ সময় পূণার্থী ও দর্শনার্থীদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠে যাদুকাটা নদীর চারপাশ। শাহ আরোফিন (রঃ)এর ওরস ও পনাতীর্থকে কেন্দ্র করে যাদুকাটা নদীর দুই তীর রাজারগাঁও ও লাউড়েরগড়ে বসে বিরাট বারুনী মেলা। মেলায় হাজার হাজার দোকানপাট বসে। এসব দোকানপাট থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা উঠানো হয়। চোরাচালানীরা ওপেন বিক্রি করে মদ,গাজা,হেরুইন ও মেলা বসায় জুয়ার বোর্ড। এছাড়াও অনৈতিক ঘটনায় চোরাচালানী,মদ,গাজা ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন মামলার চিহ্নিত আসামীদের সহযোগীতায় চুরি-ডাকাতি,ছিন্তাই হয়। চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গনধৌলাইয়ের শিকার হয় চাঁদাবাজরা। এসব বন্ধ করতে আইনশৃংখলাবাহিনী কঠোর নজরদারীর দাবী জানান সবাই।

বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আ,লীগের সদস্য নিজাম উদ্দিন বলেন,প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মেলা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য বিষয়ের উপর কড়া নজরদারীর জন্য পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবি,এনএসআই,ডিএসবি,ডিবি,সাদা পোশাকধারী পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যগন বিশেষ নজরধারী করা ছাড়াও ঝুঁকিপুর্ণ সড়ক গুলোতে যাতায়াতকারীদের নিরাপত্তায় টহল দেবে। কোন অনিয়ম হলে আইনগত ব্যবস্থা নেবে আইনশৃংখলাবাহিনী। সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষসহ সবার সাথে কথা হয়েছে।

অদ্বৈত্য প্রভু জন্মধামের পরিচালনা কমিটির সভাপতি করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল জানান,এখানে না আসলে জীবনের পূর্নতা আসে না। ৩দিন ব্যাপী এই উৎসবে দেশে-বিদেশের লক্ষ লক্ষ পূনার্থী ও আশেকানদের আগমন ও নিরাপদে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে প্রতি বছরেই জেলা প্রশাসন,পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবি,সাংবাদিকসহ সর্বস্থরের জনসাধারন সার্বিক সহযোগীতা পূর্বেও করেছেন এবারও আশা করি সবাতর্œক সহযোগীতা পাব।

তাহিরপুর থানার অফিসার্স ইনচার্য নন্দন কান্তি ধর জানান,মেলা ও পর্নতীর্থ এলাকায় ও আসা-যাওয়ার পথে সকল প্রকার অনিয়ম ও আইনশৃংখলা বজার রাখার সবোর্চ্চ চেষ্টা করব। কোন অন্যায় কারীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল জানান-দু-ধর্মের দুটি মেলায় আসা লোকজনের নিরাপত্তার জন্য সকল প্রকার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মেলায় যে কোন অনিয়মে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া জন্য বলা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।