বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কুলাউড়ায় সরকারের নিয়োগ করা শিক্ষকের মাসিক বেতন দুই হাজার টাকা!



নিউজ ডেস্ক:: মো. শাহ আলম শিক্ষকতা করেন এমপিওভুক্ত একটি গার্লস হাই স্কুলে। কিন্তু মাসে বেতন পান মাত্র দুই হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে তিন বেলা খাওয়া হয় না তার। সকালে একটা বিস্কুট অথবা ছোট একটি পাউরুটি আর এক কাপ চা খেয়ে স্কুলে যান তিনি।নিবেদিতপ্রাণ এই শিক্ষককে দুপুরের টিফিনের খাবার শেয়ার করেন স্কুলের অন্য শিক্ষকরা। কখনও দুপুরে না খেয়েও কাটাতে হয় তাকে। আর রাতের খাবার খান একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকের বাসায়। এভাবে চলছে দুই বছর।

শুধু শাহ আলমই নন, তার মতো কষ্টে দিনযাপন করছেন এনটিআরসিএ (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) এর নিয়োগ পাওয়া আরও তিন হাজার শিক্ষক। এদের মধ্যে ৫০ জনের মতো শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে কোনও টাকা না পেয়ে।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক শাহ আলম সম্প্রতি তার এই দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মুক্তাদির চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এনটিআরসিএ নিয়োগ দিয়েছে শাহ আলমকে। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) এমপিওভুক্ত করছে না।আমাদের সামর্থ্য নেই তাকে বেতন দেওয়ার। তাই স্কুলের একটি রুমে থাকার জায়গা দিয়েছি। মাত্র দুই হাজার টাকা দিই তাকে। এ কারণে শিক্ষকতার পাশাপাশি তার বিকল্প আয়ের ব্যবস্থার চেষ্টা আমরা করছি। স্কুলের একটি ক্যান্টিন রয়েছে সেটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে তাকে। তাহলে তার কিছু আয়ের ব্যবস্থা হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার উজাল খলসী গ্রামে বাড়ি শাহ আলমের। তার বাবা মো. সাবান পেশায় নরসুন্দর। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এই পেশার উপার্জনে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মুক্তাদির চৌধুরী বলেন, ‘শাহ আলম নিবেদিতপ্রাণ শরীরচর্চা শিক্ষক। তার বেতন হলে আমরা তাকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারতাম।’ পরিবারের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহ আলম বলেন, ‘আমি এখনও উপার্জনহীন। ষাটোর্ধ্ব বাবা-মায়ের খাওয়া-পরা কিংবা চিকিৎসার খরচ দিতে পারি না। অবশ্য তা নিয়ে বাবা-মায়ের কোনও কষ্ট নেই। শুধু আমি উপার্জন করে নিজে চলতে পারলেই বাবা-মা খুশি হতেন। বাবা-মা প্রায়ই জানতে চান, বেতন হয়েছে কিনা। তাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলি—খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। চলতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না।’

যেভাবে শাহ আলমের লেখাপড়াও শিক্ষক হয়ে ওঠা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার উজাল খলসী গ্রামের মোড়ে শাহ আলমের বাবার নরসুন্দরের (নাপিত) দোকান।খেয়ে না খেয়ে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। গ্রামে ছোট একখণ্ড জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকলেও শরীর চলে না তার। গ্রামের মোড়ে আজকাল আর কেউ চুল কাটতেও যান না। শাহ আলম এসএসসি ২০০৫ এবং ২০০৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। কিন্তু অনার্সে ভর্তির খরচ জোগাড় করতে না পারায় পরবর্তীতে বাড়তি পরিশ্রম করে টাকা জোগাড় করে দরিদ্র কোটায় দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান শাহ আলমকে। অনার্স পাস করার পর মাস্টার্স না করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি টিচার ট্রেনিং কলেজে ভর্তি হন।

২০১৪ সালে বিপিএড পাসের পর ২০১৫ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে পরীক্ষায় শিক্ষক হিসেবে নিবন্ধিত হন। এনটিআরসিএ ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শরীরচর্চা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয় তাকে। শাহ আলম ওই বছরের ১ নভেম্বর শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

যে কারণে এমপিও হয়নি
২০১৭ সালে শাহ আলম এমপিওভুক্ত (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) হতে আবেদন করেন। কিন্তু অনার্স পাসের সনদ দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের হওয়ার কারণে তার আবেদন বাতিল হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১৩টি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল হাইকোর্টের রায়ে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই নামে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি না দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয় রায়ে।

দারুল ইহসানের সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে রায়ে বলা হয়, ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিলের আগের সনদধারীদের সনদের গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করবে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। আদালতের রায়ে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই শাহ আলম পাস করার কারণে বিপিএডে ভর্তি ও সনদ পেতে সমস্যা হয়নি। সরকারের শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষাতেও তার সমস্যা হয়নি। সরকারিভাবে তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগও দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এনটিআরসিএ নিয়োগ দিলেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) এমপিওভুক্ত করছে না। মাউশির বক্তব্য, বিধি মোতাবেক নিয়োগ দেওয়া হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ছাড়া এমপিও দেওয়া যাবে না। মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পাওয়া গেলে তখন আমরা এমপিও দেবো।’

সরকারের নিয়োগ দেওয়া অন্য শিক্ষকরাও বঞ্চিত
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার পূর্ব নড়িয়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম নড়িয়া বিহারী লাল উচ্চ বিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান ২০১৬ সালে। আড়াই বছর ধরে চেষ্টা করে এমপিভুক্ত হতে পারেননি তিনি। বিদ্যালয়টি পরে সরকারি হয়েছে। শিক্ষকদের পদায়ন হলেই সবাই সরকারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে বেতন পাবেন। অথচ তাকে বিদ্যালয় থেকে বর্তমানে বেতন দেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা।
এমপিওভুক্ত না হলেও স্কুল থেকে সরকার নির্ধারিত বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও তার বেতন শুরু করা হয় মাত্র এক হাজার টাকা দিয়ে। কয়েক দফায় বেতন বাড়িয়ে তাকে বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে ৫ হাজার টাকা।রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিজ যোগ্যতায় এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছি। কিন্তু আড়াই বছর ধরে বেতনভুক্ত হতে পারিনি। আমি ইংরেজি বিষয়ে ২০১১ সালে অনার্স করেছি। মাস্টার্স করেছি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে। এখন বেতন পাচ্ছি না।

পূর্ব নড়িয়ায় নিজের বাড়িটি পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন স্কুলের পাশে ৫ হাজার টাকায় ভাড়া থাকি। স্কুলের দেওয়া ৫ হাজার টাকা আর টিউশনি করে আরও ছয় হাজার টাকা পাই, তা দিয়ে স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে সংসার চালাই। এখন কষ্ট লাগে সরকার নিয়োগ দিয়েছে সবাইকে। কিন্তু কেউ কেউ বেতন পাচ্ছেন আর কেউ কেউ পাচ্ছেন না। আমাদের তদবিরে জোর নেই তাই এমপিওভুক্ত হতে পারছি না। স্কুল সরকারি হলো অথচ আমি বেসরকারি বেতনটিও পাচ্ছি না।’

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নুরাইনপুরের অগ্রণী বিদ্যাপিঠের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে ২০১৬ নিয়োগ পাই। স্কুলে যোগ দিই ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর। আড়াই বছর বিনাবেতনে চাকরি করছি। যখন পরীক্ষা হয় তখন স্কুল থেকে কিছু টাকা দেয়। জীবন বাঁচাতে বিভিন্ন জনের বাসায় পড়িয়ে ৬ থেকে সাত হাজার টাকা আয় করি।

দারুল ইহসান থেকে পাস করা অনেকেই এমপিওভুক্ত হলেও আমি পারিনি। আমার অপরাধ ২০১১ সালে ইংরেজি বিষয়ে দারুল ইহসান থেকে অর্নাস পাস করেছি। যদিও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরে বিএড করেছি।’