বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কুলাউড়ায় মসজিদের ইমামের গরু জবাই নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের উত্তেজনা,আজান দিয়ে বাঁধা



নিউজ ডেস্ক:: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার লুয়াইনি চা বাগান মসজিদের ইমামের গরু জবাইকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক বেশি থাকায় তারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এজন্য তারা গত বছর থেকে এ জায়গাগুলোতে গরু জবাই নিষিদ্ধ করে। গরু জবাইয়ের জন্য দুইটি স্থান নির্ধারণ করে দেয়। কোন মুসলমান ইচ্ছা করলেও নির্ধারিত স্থান ব্যতীত গরু জবাই করতে পারে না। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি মসজিদের ইমাম মৃত গরু জবাই করেছেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এ পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এ নিয়ে জেলাজুড়ে প্রতিবাদ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।

জানা যায়, ঘটনাটি শুনে তাৎক্ষণিকভাবে শনিবার রাতে বাক্ষ্মণবাজারে হাজারো লোকের উপস্থিতিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর ব্যাপক ভাইরাল হয়।

লুয়াইনি চা বাগান মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ সৈয়দ আহমদ চৌধুরী জানান, গত মঙ্গলবার (৯ মার্চ) সকাল সাড়ে ৮টায় মসজিদ থেকে মক্তব পড়ানো শেষে তার গৃহপালিত পশু (বাছুর) কে খাবার দেওয়া হয়। বাসপাতি নামক খাবার খাওয়ানোর সময় হঠাৎ করে বাছুরের গলায় তা আটকে যায়। আটকে যাওয়ার পর গরুটি তা বের করে ফেলে দেয়। পরবর্তীতে তিনি জোর করে বাছুরটিকে পূণরায় খাওয়াতে চেষ্টা করেন। এমতাবস্থায় বাছুরটি মাটিতে পড়ে যায়। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর তিনি মনে করেছিলেন গরুটি মরে যাওয়ার চেয়ে জবাই করে ফেলি। পরে তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে গরুটি জবাই করেন।

তিনি আরোও বলেন, গরুটি জবাই করার পর চা বাগানের সভাপতি ওজিত কৈরী, অন্তু, বিশ্বজিৎ, রতনলাল সহ শ’খানেক লোক বলে আমি নাকি মরা গরু জবাই করেছি এজন্য তারা আমার বাড়ি ঘেরাও করেন। এ সময় অন্তু আমার ঘরে দরজার কিনারে এসে বলে ‘তুই ঘর থেকে বের হও’ তোকে আজ শেষ করে দেব। অন্তু একটি লাটি নিয়ে আমাকে মারতে আসে। আমার স্ত্রী আগলে ধরে ঘরের দরজা লাগিয়ে দেয়। পরে আমি প্রাণ বাঁচাতে ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে মুসলিম পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সমছু মিয়ার দোকানে যাই। এসময় তারা বলে হুজুরকে বিদায় করে দাও এবং মসজিদে যেন হুজুর আজান না দেয়। ঘটনার দিনই ইমামকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরবর্তীতে তিনি বাগানের জিএমের কাছে গিয়ে বলেন, তার চাকুরী ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।

সৈয়দ আহমদ চৌধুরী জানান,এখানে ১২ বছর ধরে তিনি ইমামতি করছেন।তিনি আসার আগে আরেকজন ইমাম মসজিদের মাহফিলে গরু জবাই করেন। এজন্য ঐ ইমামকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।

মসজিদের ইমাম আহমদ চৌধুরী আরোও বলেন, আমি যখন পালিয়ে সমসু মিয়ার দোকানে যাই তখন চা বাগানের শ্রমিকরা বাগানের জিএমের বাংলোতে এসে বিক্ষোভ করে। পরে এখানে সমছু মিয়াসহ মুসলিম পঞ্চায়েতের কয়েকজন লোক বাংলোতে যান। বাংলোতে জিএম শ্রমিকদের বুঝাতে ব্যর্থ হন। পরে সেখানে যান বাক্ষ্মণবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মমদূদ হোসেন। শ্রমিকরা চেয়ারম্যানকে বিচার করতে বলেন। এসময় চেয়ারম্যানসহ বাগানের জিএম মুসলিম পঞ্চায়েতের সভাপতি সমছু মিয়া সহ কয়েকজনকে দায়িত্ব দেন বাছুরটি মাঠিতে পুঁতে ফেলার জন্য। পরে তারা এসে বাছুরটি পুঁতে ফেলেন।

মুসলিম পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সমছু মিয়া বলেন, মসজিদের ইমাম যে স্থানে গরু জবাই করেছেন সেখানে কয়েকটি হিন্দু পরিবার আছে। গরু জবাইয়ের জন্য আলাদা স্থান রয়েছে। মসজিদের ইমাম রুগ্ন গরুটিকে যে স্থানে জবাই করেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রতি দেখিয়ে সেখানে গরু জবাই করা হয় না।

এ ব্যাপারে বাক্ষ্মণবাজার ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য সত্য নারায়ণ নাইডু বলেন, এখানে কিছু গণ্ডগোল হয়েছিল মসজিদের ইমামের গরু জবাইকে কেন্দ্র করে। তবে বিষয়টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বাগানের জিএম সমধান করে দিয়েছেন। পরে বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়।

বাক্ষ্মণবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মমদূদ হোসেন বলেন, শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলে আমাকে ফোন দেওয়ায় সেখানে যাই। বাগান কর্তৃপক্ষকে বলি যে বিষয়টি সমাধান করার জন্য। এবং শ্রমিকদের বলি কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য।

এ ব্যাপারে লুয়াইনি চা বাগানের সিনিয়র সহকারি ব্যবস্থাপক মো. শামসুল হক ভূঁইয়া বলেন, চা বাগানের নির্দিষ্ট একটি আইন আছে। এর আগে বাগানে কুরবানি হতো না। পরে কুরবানির জন্য নির্দিষ্ট স্থান করে দেওয়া হয়েছিল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা গরুটিকে পুঁতে ফেলার জন্য বলিনি। আমরা বলেছি মসজিদের ইমামের বাড়ি থেকে গরুটি সরিয়ে ফেলা হোক। যাতে বিষয়টি সমাধান হয়।

কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ ইয়ারদুস হাসান বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। আমরা ঘটনাটি নজরদারিতে রেখেছি। যাতে কোন অপ্রীতিকর অবস্থার তৈরী না হয়।

জানা যায়, এই বাগানের ৩০-৪০ পরিবার মুসলামান বসবাস করলেও তারা উগ্র কিছু সনাতনী ধর্মবলম্বী লোকদের কারনে অনেকটাই জিম্মিভাবেই ধর্ম কর্ম পালন করতে বাধ্য হন। মুসলামানদের নিজ বাড়িতে গরু কুরবানি করতে দেয়না ওই বাগানের সনাতনী ধর্মবলম্বীরা। এমনকি বাগানের মসজিদের পুকুরে দূর্গা পূঁজারসময় দেবী দূর্গা বির্সজন দিলেও এ নিয়ে কোন টু শব্দও করেন না ওই বাগানের স্থানীয় মুসলমানরা। কিন্তু মুসলামনরা তাদের বসত ভিটায় কুরবানী কিংবা অনান্য ধর্মীয় কাজে গরু জবাই করলে তারা নিষেধ দিয়ে দাঙ্গা ফাসাদ সৃষ্টি করে।