বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ইন্টারনেটের অপব্যবহার ও অভিভাবকের অসচেতনতা



শ্রীধর দত্ত ::

বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানব কল্যাণের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। বিশ্বায়নের যুগে তথ্যপ্রযুক্তি অপরিহার্য। তথ্য প্রযুক্তি বিশ্বকে আজ হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। সেলফোন ব্যবহার করে আমরা বিভিন্ন দেশ ,বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন উদ্ভিদ ও বিভিন্ন প্রাণী সম্বন্ধে অজানাকে জানতে পারি। ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে সেল ফোন ব্যবহার করেন আমরা খুব সহজে মেসেঞ্জার, ইমু, হোয়াটসঅ্যাপ ,ভাইবার, স্কাইপ,ও বহুল প্রচলিত ফেইসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশে কিংবা বিদেশে আপন-জন , বন্ধু -বান্ধব এবং অফিসের অনেক দরকারি তথ্য আদান প্রদান করে থাকি। যা কিনা আজ থেকে ২০ বছর আগেও সম্ভব ছিল না। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহুর্তের মধ্যে যে কোন খবর আদান-প্রদান সহজলভ্য।

যে কোন প্রযুক্তির যেমন ভালো দিক রয়েছে ,ঠিক তেমনি খারাপ দিকও রয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হচ্ছি। বিদেশী সংস্কৃতি মানে অপসংস্কৃতি নয়, যদি তা আমাদের জীবনকে বিপথে পরিচালিত না করে। যে সংস্কৃতি আমাদের জীবনকে বিপথে পরিচালিত করে সেটাই হলো অপসংস্কৃতি । সেটা দেশী বা বিদেশী হোক না কেন। কোন জাতি বা দেশের ভিতর একবার অপসংস্কৃতি ঢুকলে তা অপসারণ করা খুবই কঠিন।

সংস্কৃতি হচ্ছে কৃষ্টি ও ঐতিহ্য।একটা জাতির দীর্ঘদিনের জীবনাচরণের ভিতর দিয়ে যে মানবিক মূল্যবোধ ও সুন্দরের পথে কল্যাণের পথে এগিয়ে যায় তাই সংস্কৃতি। সাধারণ অর্থে সংস্কৃতি বলতে আমরা নাচ-গান, নাটক, কবিতা, আবৃত্তি ,কৌতুক ইত্যাদিকে বুঝি। সংস্কৃতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেন সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে মহৎভাবে বাঁচা অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য মানুষের নৈমিত্তিক প্রচেষ্টাই সংস্কৃতি, আর অপসংস্কৃতি হল এর বিপরীত।অপসংস্কৃতি মানুষকে কলুষিত করে এবং জীবনের সৌন্দর্যের বিকাশ স্তব্ধ করে দিয়ে শ্রীহীনতা দিকে ঠেলে দেয়। জীবনের সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সমাজে বসবাসরত মানুষের প্রতিটি কার্যকলাপই তাঁদের সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। সংস্কৃতি এবং জীবন একে অপরের পরিপূরক।

বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের জাতীয় জীবনে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। অপসংস্কৃতির হিংস্র ছোবলে আমাদের কোমলমতি কিশোর-কিশোরী ও তরুন সমাজ বিপথগামী হচ্ছে। আমাদের তরুণ সমাজের উপর ইন্টারনেটের কুপ্রভাব গভীর ও ব্যাপক। সমাজের তরুণ-তরুণীরা ফেইসবুক, ইউটিউব ব্যবহারের মাধ্যমে যৌন সুড়সুড়ি মূলক সস্তা কাহিনী, নাচ-গান, পোশাক-আশাক অন্ধভাবে অনুকরণ করতে গিয়ে অপসংস্কৃতির শিকার হচ্ছে।এমনকি অশ্লীল ছায়াছবি ও নীল ছবির দর্শনে ও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাঁরা দেশী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিয়ে কু অভ্যাসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আত্মতৃপ্তি পাচ্ছেন। সংস্কৃতি যেখানে মানুষকে সুন্দর পথ দেখায়, সেখানে অপসংস্কৃতি মানুষকে সুন্দর থেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় । অপসংস্কৃতি স্থায়ী নয় তা ক্ষণিকের জন্য উত্তেজক। নিছক যৌবিক পরিতুষ্টির পাশবিক চিন্তাধারা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের অভিভাবকের অযত্ন ও অবহেলার কারণে তীব্র প্লাবনে শিকড়বিহীন কচুরিপানার মতো ইন্টারনেটযুক্ত সেলফোন কোমলমতি কিশোর কিশোরীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। যার প্রভাবে আজ কিশোররা বিভিন্ন অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি ২-৫ বছরের মতো নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণ এবং হত্যার মতো জঘন্য কাজ করতে ,কিছু নরপশু দ্বিধাবোধ করছে না। সমাজে আজ অনৈতিক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ও পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। পত্রিকার পাতা খুললেই নারীর প্রতি ব্ল্যাকমেইল, সহিংসতা, অত্যাচার, ধর্ষণ, হত্যা এবং পুড়িয়ে মারা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা আমাদের সমাজকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। কথায় আছে -“সর্ব অঙ্গে ব্যথা হলে ওষুধ দিবো কিসে”। অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তরুণ সমাজ লোভ-লালসার চরিতার্থ করার এক উদ্ভট জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। যার কারণে অশ্লীলতার নোংরামি খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ প্রতারণা সমাজে বেড়েই চলেছে।দেশ ও সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লালিত মূল্যবোধ ভিত্তিক ধারণা ও নৈতিকতা, আদর্শ অপসংস্কৃতির কারণে বিচ্যুত হচ্ছে।

আজ থেকে ২০ বছর আগে আমাদের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন খেলা ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, সাঁতার কাটা, গল্পগুজব, আড্ডা ও বই পড়া এগুলো নিয়ে আনন্দ ফুর্তির সাথে সময় কাটাতো। শারীরিক ও মানসিকভাবে ছিল খুবই উন্নত। আজ এসব জায়গায় মোবাইল ফোন দখল করে ফেলেছে। সবাই যেন ফোনেই ব্যস্ত ,খেলাধুলার করার সময় নেই। আজ ছোট শিশুরা পর্যন্ত মোবাইলে নাচ-গান,ভিডিও গেইম দেখতে অভ্যস্ত। ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে এবং অলস ও অযোগ্যে মস্তিষ্কে পরিণত হচ্ছে।

তাই তরুণ সমাজকে অপসংস্কৃতির হাত থেকে বাঁচাতে হলে অচিরেই আমাদের সমাজ থেকে অপসংস্কৃতির প্রভাব দূর করতে হবে এবং অভিভাবক মহলকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। আমাদের তরুণ সমাজ যেহেতু জাতির কর্ণধার, সেহেতু তারা অপসংস্কৃতি গ্রহণ করার পূর্বেই তাদেরকে সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় জ্ঞান দিতে হবে। যারা অশ্লীল ভিডিও আপলোড করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয় তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা করতে হবে। শুধু তথ্য প্রযুক্তি আইন থাকলে হবে না, এর যথাযথ ব্যবহার করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে রাষ্ট্র পরিচালক ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের। তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার সমাজ দেশ তথা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই আমাদের অভিভাবক মহলকে আরো সচেতন হতে হবে, যাতে ছোট ছেলেমেয়েকে সেলফোন দেওয়া থেকে যেন বিরত থাকে । প্রতিটি অভিভাবকের উচিত তাদের সন্তানদেরকে গাইড দেওয়া , তাঁরা কোথায় যাচ্ছে, কি করছে সেজন্য সজাগ দৃষ্টি রাখা। সন্তানের প্রতি অভিভাবকের সুদৃষ্টি ও সুচিন্তায় সমাজ ও দেশকে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে।

লেখক : সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী

The post ইন্টারনেটের অপব্যবহার ও অভিভাবকের অসচেতনতা appeared first on DAILYSYLHET.COM | SYLHET NEWS | BANGLA NEWS.